প্রতিবেদক : বিডিএস বুলবুল আহমেদ
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার প্লট দুর্নীতি মামলার রায় ঘোষণা এবং এর পাশাপাশি তাঁর ভল্টে বিপুল পরিমাণ (প্রায় ৮৩২ ভরি) স্বর্ণের খোঁজ মেলার ঘটনায় দলটির তৃণমূল থেকে হাইকমান্ড পর্যন্ত চরম বিব্রতকর ও হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা মনে করছেন, দলের প্রধানের এসব নেতিবাচক সংবাদ এমন এক সময়ে এলো, যখন তারা নিজেরাই গ্রেফতার আতঙ্ক এবং শত শত মামলা নিয়ে আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
আওয়ামী লীগ (এএল)-এর অভ্যন্তরে শুরু হওয়া এই নীরব সংকট শুধু আইনি বা আর্থিক বিষয় নয়, বরং এটি নৈতিকতা, আদর্শ এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিশ্বাসের ওপর চরম আঘাত বলে মনে করছেন নেতাকর্মীরা। অনেকেই হতবাক হয়ে প্রশ্ন তুলছেন, জাতির পিতার পরিবারের সদস্যদের আদৌ এমন বিপুল সম্পদ অর্জনের প্রয়োজন ছিল কি না।
শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদ নিয়ে যে বিতর্ক এখন সামনে এসেছে, তা বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের আদর্শিক বিচ্যুতি ও জবাবদিহিতার অভাবের ধারাবাহিকতাকে নির্দেশ করে।
১৯৫০-এর দশক: আদর্শের জন্ম: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং সেই সময়ে জন্ম নেওয়া জাতীয়তাবাদী চেতনা ছিল মূলত আদর্শ, ত্যাগ ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর ভিত্তি করে। এই সময় ছিল নেতৃত্বের প্রতি জনগণের অবিচল আস্থা।
১৯৭২-১৯৭৫: ক্ষমতার বলয়: স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক নতুন জাতিরাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করলেও, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা হাসিল এবং জবাবদিহিতার অনুপস্থিতি একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগে পরিণত হয়।
১৯৯০-এর দশক: পারস্পরিক অভিযোগের সংস্কৃতি: ১৯৯০ সালের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—উভয় দলই একে অপরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগকে রাজনীতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু কেউই নিজেদের সম্পদ ও ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেনি।
২০১৪-২০২৪: ‘চোরতন্ত্রে’র প্রতিষ্ঠা: বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্ষমতা ধরে রাখার শেষ দশকে (বিশেষত ২০১৪-২০২৪) আওয়ামী লীগ সরকার নিজেকে জবাবদিহি থেকে ঊর্ধ্বে মনে করে এক ধরনের ‘চোরতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করেছিল, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারই ছিল মূল চালিকাশক্তি। এই ধারার পরিণতিই হলো ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৫ সালের জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া।
ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলার রায় এবং ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে বিতর্ক সামনে আসায় আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা গভীরভাবে মর্মাহত।
টি আই বি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান (শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫): ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এই ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, "তৎকালীন সরকার এবং সরকারপ্রধান নিজেদেরকে জবাবদিহি থেকে শুরু করে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভেবেছে। যে কারণে ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের অধিকার হরণ করে ক্ষমতায় ছিল। আর ক্ষমতায় থেকে তারা চোরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই চোরতন্ত্রের শীর্ষে থাকা ব্যক্তিরা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। এটা সার্বিকভাবে বিব্রতকর। কিন্তু অবাক হওয়ার মতো নয়। অন্তত আমি অবাক নই। কারণ এটা তার ক্ষমতার অপব্যবহারের যে সার্বিক চিত্র, সেটার ক্ষুদ্র একটা অংশ।"
তিনি আরও উল্লেখ করেন, এটি সৌভাগ্যের বিষয় যে এসব এখন জবাবদিহির আওতায় আসছে এবং আরও অন্তত পাঁচ-ছয়টি মামলায় তার ও পরিবারের সম্পৃক্ততার বিষয় আছে, যেখানে আয়ের উৎস নেই এবং কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ নেতা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক): নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা যুগান্তরকে জানান, "এভাবে আর কতদিন চলবে জানি না। এখনো দলের হাইকমান্ড থেকে কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা নেই... এর সঙ্গে দলীয় সভাপতির বিরুদ্ধে একের পর এক মামলার রায় এবং নানা নেতিবাচক ঘটনা সামনে আসছে। ফলে এখন দলের হাল কে ধরবে, আর দলই বা কী নিয়ে রাজনীতি করবে তা গভীর চিন্তার বিষয়।"
আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হতবাক হওয়ার প্রধান কারণ হলো শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের কথিত আদর্শিক অবস্থান ও বাস্তব ঘটনার মধ্যেকার চরম বৈপরীত্য।
‘বঙ্গবন্ধুর মেয়ে’ বনাম গোপন সম্পদ: শেখ হাসিনা কথায় কথায় নিজেকে 'বঙ্গবন্ধুর মেয়ে' হিসেবে পরিচয় দিয়ে বলতেন যে তাঁর কোনো সম্পদ নেই, দরকারও নেই। অথচ ভল্টে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ লুকিয়ে রাখা এবং তা আয়কর ফাইলে না দেখানো, নেতাকর্মীদের মতে, দলীয় আদর্শের প্রতি এক চরম আঘাত।
খালেদা জিয়াকে আক্রমণ ও আত্ম-সতর্কতা: দুর্নীতি প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বরাবরই খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নামে বিষোদগার করতেন। সেই তিনিই কেন নিজে সতর্ক থাকলেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
নেতৃত্বের দুর্বলতা: বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড নৈতিক দিক থেকে দলটিকে দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দেবে এবং নেতাকর্মীদের মনোবল ভেঙে দেবে। বিশেষ করে, যখন দলের প্রধান নিজেকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মনে করতেন এবং এমন অন্যায়-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তখন তৃণমূলের ঝুঁকি নিয়ে সংগ্রাম করার মানসিকতা দুর্বল হওয়া স্বাভাবিক।
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, শেখ হাসিনা নিজে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা ৫ আগস্টের আগে-পরে নির্বিঘ্নে দেশ ছাড়তে পারলেও তৃণমূল নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন। সম্পদ অর্জনের এসব ঘটনা আওয়ামী লীগ কোনোদিন ফিরে এলেও ইতিহাস হয়ে থাকবে, যা দলটির রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে দিয়েছে।
দৈনিক যুগান্তর (টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মন্তব্য ও আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্য)
গুগল অনুসন্ধান ও বিভিন্ন আর্কাইভস থেকে প্রাপ্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা (১৯৫০-২০২৫)
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত শেখ হাসিনার মামলার রায় ও ভল্টে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনা (নভেম্বর, ২০২৫)
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |